সুন্দরবন, বাংলাদেশে আমার ঘুরে দেখা অন্যতম রোমাঞ্চকর এক ট্রাভেল ডেস্টিনেশন । মজার ব্যাপার হচ্ছে , কেন জানিনা , সুন্দরবন ট্যুরকে আমার সবসময় মনে হত হয়ত একটা বোরিং ট্যুর । যে কারনে খুলনাতে জীবনের দুই বছর কাটানোর পরেও যাওয়া হয়নি সুন্দরবন । কথায় আছে মক্কার মানুষ হজ্ব পায় না ।
সুন্দরবনের যাত্রা শুরু হওয়ার পরপরি বুঝতে পারলাম আমি সম্পূর্ণ ভুল । এই ট্যুর হতে যাচ্ছে আমার জীবনের অন্যতম এক্সাইটিং একটা ঘটনা ।
এবারের যাত্রাটা শুরু হচ্ছে নিজ এলাকা সিলেট থেকে । সুন্দরবন থেকে যার দূরত্ব ৪৫০ কিলোমিটার । পুন্যভুমি সিলেট থেকে ট্রেনে করে প্রথমে চলে যাব ঢাকাতে । আজকের ট্রেন জয়নিতকা এক্সপ্রেস । জয়ন্তিকা এক্সপ্রেসের ভাল দিক হচ্ছে সিলেটের চা বাগান দেখতে দেখতে সময় কেটে যায় ।
খুলনাতে আমাদের ট্যুর প্যাকেজ আগে থেকেই করা ছিল । প্যাকেজ বলতে সম্পূর্ণ শিপ আমরা রিজার্ভ করে নিয়েছিলাম । ছোট শিপ তাই ছোট টিমের জন্য দুরদান্ত ।
ঢাকা থেকে সোহাগ পরিবহন এর বাসে রওনা দিলাম খুলনার দিকে । ঢাকা খুলনার এই রোডে জার্নি করেছি বহুবার । খুলনা শহরে নামলাম ভোর চারটায় । শীতের দিন মাত্র শুরু হয়েছে । ভোরের শীতে কাপতে কাপতে চলে এলাম রুপসা ঘাটে ।
আমাদের জাহাজ মাঝ নদীতে নোঙ্গর করা । তীর থেকে ছোট ইঞ্জিন নৌকা করে চলে গেলাম মুল জাহাজে । তখনও সকাল হয় নি । যাই হোক , খুলনার মানুষ ঘুম থেকে জেগে উঠার আগেই আমাদের শিপ রওনা দিল শহর ছেড়ে সুন্দরবনের উদ্দ্যেশ্যে । দারুন একটা এক্সাইট্মেন্ট ভেতরে ভেতরে কাজ করছে । আগামি ৩ দিন কাটবে আমাদের জলের উপর । থাকা - খাওয়া নাওয়া দাওয়া সবই পানির উপরে ।
ভোরের নরম বাতাসে রুপসা নদী ধরে এগিয়ে যেতে খুব ভাল লাগছিল । মংলা রেল সেতু পার হয়ে আমরা ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছি লোকালয় ছেড়ে গহীনে । যেতে যেতে চোখে পড়বে মংলা সমুদ্র বন্দর , রামপাল বিদ্যুত কেন্দ্র । এই শিপে , লোকালয় ছেড়ে আমরা চলে যাব দূরে , যেখানে থাকে বাঘ আর হরিণের বসতি।
শিপ এ একটু পরপর রয়েছে খাবারের ব্যাবস্থা । যে যার মত বসে আড্ডা দিচ্ছে । মনে ভেতরে দারুন এক্সাইট্মেন্ট , বাঘ কি আসবে সামনে ? বাঘ মামার এলাকায় গিয়ে মামার সাথে দেখা না হলে তো ট্যুরের আট আনা বৃথা ।
যেতে যেতে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট থেকে বন্দুক হাতে তুষার ভাই যোগ দিলেন আমাদের সাথে । আগামি ৩ দিন তিনিও সার্বক্ষণিক থাকবেন আমাদের সাথে । বাঘ বা মানব সৃষ্ট আক্রমন থেকে পর্যটকদের কোন ক্ষতি না হয় সে কারনে সুন্দরবন ট্যুরে সাথে একজন বন্দুকধারি থাকেন । তুষার ভাই তার জীবনে প্রায় ১৫ থেকে ২০ বার বাঘ দেখেছেন ।
বাঘ মামা নিয়ে কিছু ছোট তথ্য দিয়ে রাখি , পৃথিবীতে বাঘ আছে মাত্র ১৩ টি দেশে , সবমিলিয়ে সাড়ে ৪ হাজারের মত । এর মধ্যে বাংলাদেশে আছে ১০০ থেকে ২০০ এর ভেতরে , বাংলাদেশের এই বাঘ পৃথিবীর মধ্যে সবচাইতে সুন্দর ও হিংস্র বাঘ , আমরা সবাই এই প্রজাতির নাম জানি রয়েল বেংগল টাইগার । বাঘের পুরো শরীর গাছপালা, ছায়া, ঝোপঝাড়ে মিশে যাওয়ার মতো ডিজাইন করা। তাই ৩০–৫০ মিটার দূরে থেকেও মানুষ বুঝতে পারে না বাঘ কাছেই আছে।
বাঘ হচ্ছে শিকারিদের মধ্যে সবচাইতে চালাক শিকারি , দল বেধে আসা পর্যটকদের বাঘও দূর থেকে দেখে এবং বুঝতে চেষ্টা করে লোক কয়জন , কেউ আলাদা হয় কিনা, আক্রমণের সুযোগ আছে কিনা ,পালানোর রাস্তা আছে কিনা । তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বাঘ শুধু দেখে, আক্রমণ করে না। সুন্দরবনে বাঘ মানুষের থেকে নিজেদের লুকিয়ে রাখতেই বেশি দক্ষ।
বহু রেঞ্জার বলেছেন মানুষ ৫০ বার বাঘের এলাকায় গেলে ৪৫ বারই বাঘ দূর থেকে দেখে কিন্তু সামনে আসে না। বাঘের এমন ক্ষমতা আছে যে সে ১–২ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্নভাবে মানুষকে নজর রাখতে পারে, কোনো শব্দই না করে পাশে পাশ দিয়ে চলে যেতে পারে, এমনকি কাছাকাছি ১৫–২০ মিটারের মধ্যে থেকেও মানুষ বুঝতে পারে না, এই কারণেই বাঘকে বলা হয় “Ghost of the forest”.
এই জংগলের ভুত মানে বাঘকে কাছে দেখার তিব্র আকাঙখা নিয়ে আমাদের শিপ এগিয়ে চলেছে , সুন্দরবনে ঢুকার পর আমাদের প্রথম ব্রেক ছিল আন্ধারমানিকে । আন্ধারমানিকে রয়েছে প্রায় ৮০০ মিটারেরে একটি ফুট ট্রেইল আর ওয়াচ টাওয়ার । বলা হয় এখানেও বাঘ দেখা যায় মাঝে মাঝে । বাঘ না থাকলেও এখানে আছে হড়িন আর বিষাক্ত সাপ । পুরো সুন্দরবনেই কিন্তু রয়েছে সাপ । তবে সাপে কাটার ঘটনা খুব কম । বনে এসে মানুষ বাঘ দেখতে চাইলেও সাপের সামনে কেউ পরতে চায় না । সবচাইতে ভয়ংকর ব্যাপার হচ্ছে এই সাপ গুলো মাটির সাথে মিশে থাকে তাই বেশির ভাগ সময় দেখা যায় না ।
সুন্দরবন যাওয়ার পথে বাকি পথ আর কোন দোকান নেই । তাই কোন কেনাকাটা প্রয়োজন হলে এখান থেকেই কিনে নেয়া ভাল ।
আন্ধারমানিকে একটা বিরতির পর আমাদের শিপ একটানা চলতে থাকবে এই বনের প্রায় শেষ সীমানায় বংগপসাগর পর্যন্ত । যেতে যেতে রাত হয়ে যাবে । রাতে শিপ নোঙ্গর করা থাকবে মাঝ নদীতে ।
পরদিন সকালে খুব ভোরে প্রায় ৫ টার দিকে আমরা রওনা দিলাম কটকার দিকে, এটা শরনখোলা রেঞ্জে , কপাল ভাল থাকলে ভোর বেলা এখানে বাঘ দেখা যায় ।
কটকাতে ঢুকে দেখলাম প্রচুর হরিন এখানে ঘুরাঘুরি করছে দল বেধে। সুন্দরবনে হরিণের সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ । এখানে রয়েছে বানর আর শুকর যেগুলো চোখের সামনে ঘুরাঘুরি করে সব সময় । যাই হোক কটকাতে এসে দেখতে পারলাম সিডর এর ধবংসলিলা কেমন ছিল । ২০০৭ সালের সিডরের ধবংসলীলা এখনো রয়ে গেছে বন জুড়ে । এর পাশেই রয়েছে সমুদ্র সৈকত ।
কটকা থকে সাগরের সূর্যোদয় দেখে থেকে আমরা চলে যাব জামতলাতে ।
জামতলা থেকে বের হতেই প্রথম বাঘের পায়ের ছাপ দেখতে পেলাম । পায়ের ছাপ দেখতে পাওয়া মানে আশে পাশেই বাঘ আছে , সাধারনত বনের চাইতে নদীর পারেই বাঘের দেখা পাওয়া যায় বেশি । কারন বাঘ গুলো পানি খেতে নদীর পাশে আসে , বেশিরভাগ পর্যটক তখনই বাঘের দেখা পান ।
এখান থেক আমাদের যাত্রা ডিমের চরে । পুরো সুন্দরবনের মধ্য এই ডিমের চরই সবচাইতে ইন্টারেস্টীং পয়েন্ট । কারন ডিমের চরেই গিয়ে দেখলাম একদম তাজা আর স্পস্ট বাঘের পায়ের ছাপ , ছাপটি মনে হচ্ছে মাত্র কিছু ক্ষন আগে এখান দিয়ে বাঘ হেটে গিয়েছে , এমনও হতে পারে সে আশে পাশেই রয়েছে । এই পায়ের ছাপের সাথে ছিল আরও দুই বাচ্চা বাঘের পায়ের ছাপ । বলে রাখা ভাল ডিমের চর এ বাঘ আসে বাচ্চা দিতে আর বাচ্চা সহ বাঘ গুলো হিংস্র হয় বেশি ।
জলজ্যান্ত একটা বাঘ আমাদের আশে পাশেই আছে ভাবতেই ভাল লাগছে । অনেক সময় ডীমের চর ঘুরাঘুরি করে বাঘ দেখতে না পেলেও খুশি করে দিল এই চর ধরে থাকা সমুদ্র সৈকত । ঘন জংগল , রঙ্গিন পাতা আর সাগরে আওয়াজ মিলে এটি নিসন্দেহে বাংলাদেশের অন্যতম সুন্দর সৈকত । বলে রাখা ভাল এখানে গোসল করা নিষেধ । কারন এই সাগড় পারে রয়েছে বিপদজনক চোরাবালি ।
যেখানে বাঘের ভয় সেখানে সন্ধ্যা হয় । কিন্তু সন্ধ্যাও নামল না বাঘও এল না । ডিমের চরে বাঘের কাছাকাছি গিয়েও আমাদের বাঘ না দেখে ফিরে আসতে হল । তবে আমরা যে সময় এসেছি সে সময় সাধারনত বাঘ ঘন জংগল থেকে বের হয় না । বাঘ ঘনজঙ্গল থেকে বের হয় খুব ভোরে অথবা সন্ধ্যার দিকে ।
আজকে ট্যুরের দ্বিতীয় দিন এসে মনে হচ্ছে দেখতে দেখতে রোমাঞ্চকর সময়গুলো পার হয়ে গেল । দুই দিন ধরে পানির উপর আর বাঘের খোজে জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াচ্ছি , সবচেয়ে ভাল লাগার বিষয় হচ্ছে ফোনে নেটওয়ার্ক নেই । ফোনে নেট শুন্য হয়ে জংগলে থাকার একটা জংলি আনন্দ অনুভব হচ্ছে । এখানে শুধু টেলিটক এর নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় , বাকি গুলো মাঝে মাঝে আসে যায় , রেগুলার না , তাই যারা আসবেন তারা ইমারজেন্সির জন্য একটা টেলিটক সিম সাথে রাখতে পারেন ।
গত ৪৮ ঘন্টা পানি আর জংগলে থাকতে থাকতে নিজেকে এই বনের অংশ মনে হচ্ছে । আশ্চর্য ব্যাপার হচ্ছে, লোকালয়ে ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে না । মনে হচ্ছে এখানেই পড়ে থাকি ।
দেড় দিন ধরে শুধু সবুজ গাছ দেখছি দুই চোখে , অথচ বিশাল এই বনের মাত্র ক্ষুদ্র এক অংশ দেখছি আমরা , আরও কত বিশাল কত রহস্যময় এই বন । না জানি কত ধরনের অদ্ভুত প্রাণী আছে এই বনের ভেতরে ।
ফিরতে ফিরতে যাত্রার তৃতীয় দিন ফেরার সময় দেখতে নামব করমজল । করমজল হচ্ছে সুন্দরবনের প্রথম দিকের অংশ , যারা ডে টুরে সুন্দরবন আসতে চান তারা সাধারনত এখানেই আসেন ।
করমজলে নামার পর বানর হতে সাবধান থাকবেন । সাথে পলিথিন বা খাবার জাতীয় কিছু থাকলে এরা টান দেয় । আমার চোখের সামনে একজনের হাতে কামড় দিল । মনে হচ্ছে এই জায়গার নাম করমজল না হয়ে বানরজল হওয়া দরকার ছিল ।
করমজলে এসে কাছে থেকে কুমিড় দেখলাম । এখানে রোমিও জুলিয়েট নামে কুমিড় আছে যাদের নাম ধরে ডাকলে তারা কাছে আসে । আমরা ডাকাডাকি করলেও আসল না । মনে হয় আমাদের ডাক পছন্দ হয় নি । করমজলের ভেতরেও ফুট ট্রেইল আছে । সেই ট্রেইল ধরে আমরা ঘুরে দেখলাম সুন্দরবন এর আরেকটু সৌন্দর্য ।
নদী , জংগল , নৌকা এই তিনে ধীরে ধীরে ফুরিয়ে এল আমাদের সুন্দরবনের দিন । ৩ দিন খুব অল্প সময় এই বনকে কাছে থেকে দেখার জন্য । লোকালয়ে ফিরতে ফিরতে মনে হচ্ছে পেছনে ফেলে আসা জঙ্গল আমার খুব আপন কেউ । তারা অপেক্ষা করছে ফিরে যাওয়ার জন্য । আবার ফিরে আসব সুন্দরবনে , ফিরতে আমাকে হবে । এক অদ্ভুত মায়ায় জড়িয়ে গেল সুন্দরবন ।








0 মন্তব্যসমূহ